বাংলার ইতিহাসে পাল সাম্রাজ্যের উত্থান কেবল একটি রাজবংশের ক্ষমতার বিস্তার ছিল না, বরং এটি ছিল এক দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংহতির অধ্যায়। গোপালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে ‘মাৎস্যন্যায়’ বা অরাজকতার অবসান প্রক্রিয়া শুরু হয়, তার পরবর্তী ধাপে পাল শাসকরা বাংলাকে একটি আঞ্চলিক রাজ্য থেকে সর্বভারতীয় সাম্রাজ্যশক্তির মর্যাদায় উন্নীত করেছিলেন। পাল সাম্রাজ্যের উত্থান নিয়েই আজকের লেখা।
গোপাল তাঁর রাজত্বকালের অধিকাংশ সময় বাংলার অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করেছিলেন। তিনি উত্তর ও পশ্চিম বাংলার (বরেন্দ্র ও গৌড় অঞ্চল) ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি মগধের (বিহার) কিছু অংশও পাল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।[1] গোপাল প্রায় ২০ বছর রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর শাসনকালের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো তিনি অরাজকতার সময়কার বিশৃঙ্খলা দমন করে একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করেন। পরবর্তীতে এই প্রশাসনিক ব্যবস্থাই তাঁর পুত্র ধর্মপালকে উত্তর ভারত অভিযানের সময় অভ্যন্তরীণ অন্তর্কোন্দল থেকে মুক্ত রেখেছিল।[2] গোপাল বৌদ্ধ ধর্মের পরম অনুরাগী ছিলেন, তিনি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রতি ধর্মীয় সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছিলেন এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় রেখেছিলেন। তিব্বতি ঐতিহাসিক লামা তারানাথের মতে, গোপাল মগধে ওদন্তপুরী বা ওদণ্ডপুর মহাবিহার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এটি প্রাচীন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়।[3] গোপালের সহাবস্থানের উদাহরণ পরবর্তী পাল রাজাদের ধর্মীয় নীতির ধারা তৈরি করে দেয়।
গোপালের পুত্র ধর্মপাল সিংহাসনে আরোহণ করে অনুধাবন করেন যে, বাংলার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে উত্তর ভারতের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। কনৌজ তখন উত্তর ভারতের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। কনৌজের অধিকার নিয়ে পাল (বাংলা কেন্দ্রিক সাম্রাজ্য), গুর্জর-প্রতিহার (রাজস্থান কেন্দ্রিক সাম্রাজ্য) এবং রাষ্ট্রকূট (দাক্ষিণাত্য কেন্দ্রিক সাম্রাজ্য)—এই তিন রাজ্যের মধ্যে এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শুরু হয়, ইতিহাসে তা ‘ত্রিশক্তি সংঘর্ষ’ নামে পরিচিত।[4]
ধর্মপাল ছিলেন দূরদর্শী ও কূটনীতিজ্ঞ। তিনি কেবল যুদ্ধের ময়দানে নয়, বরং রাজনৈতিক কৌশলেও দক্ষতার পরিচয় দেন। খালিমপুর তাম্রশাসন অনুযায়ী, তিনি কনৌজের ইন্দ্রায়ুধকে পরাজিত করে নিজের অনুগত চক্রায়ুধকে সিংহাসনে বসান এবং ভোজ, মৎস্য, মদ্র, কুরু, যদু, যবন, অবন্তী, গান্ধার ও কীর (প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য ও জনপদের শাসকগোষ্ঠী) রাজন্যবর্গের উপস্থিতিতে এক বিশাল রাজদরবার আহ্বান করেন।[5] ধর্মপাল কেবল বাংলার রাজা ছিলেন না, তিনি ‘উত্তরপথস্বামী’ বা উত্তর ভারতের অধিপতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। যদিও রাষ্ট্রকূট ও প্রতিহারদের আক্রমণে তিনি সাময়িকভাবে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর কূটনৈতিক চাল এবং রাষ্ট্রকূটদের দাক্ষিণাত্যে ফিরে যাওয়ার সুযোগে তিনি তাঁর হারানো আধিপত্য পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন।
ধর্মপালের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র দেবপাল সাম্রাজ্য বিস্তারে আরও আগ্রাসী ভূমিকা পালন করেন। বাদল স্তম্ভলিপি অনুযায়ী, তিনি উৎকল (ওড়িশা), কামরূপ (আসাম) এবং হুন (যাযাবর জাতি) ও কম্বোজদের (জাতি) দমন করে পাল সাম্রাজ্যের সীমানা হিমালয় থেকে বিন্ধ্য পর্বত পর্যন্ত বিস্তৃত হয় এবং ভৌগোলিক প্রসারের শিখরে পৌঁছায়।[6]
পাল রাজাদের কৃতিত্ব কেবল যুদ্ধজয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁদের আসল সাফল্য ছিল প্রশাসনকে সুসংহত করা এবং একটি স্থায়ী আমলাতন্ত্র গড়ে তোলা। পাল যুগে শাসনব্যবস্থা ছিল রাজতান্ত্রিক, কিন্তু তা স্বেচ্ছাচারী ছিল না। রাজাকে সহায়তা করার জন্য ‘মন্ত্রী’, ‘মহামাত্র’ (উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তা) এবং ‘সান্ধিবিগ্রহিক’ (পররাষ্ট্র ও যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী)-এর মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল।[7] কেন্দ্রীয় শাসনের পাশাপাশি স্থানীয় শাসনে ‘বিষয়পতি’ ও ‘গ্রামপতি’দের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, যা প্রশাসনের শিকড়কে তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল।
সামাজিকভাবে পাল যুগ ছিল এক বিশেষ রূপান্তরের সাক্ষী। এই যুগে বাংলার সমাজে জাতিভেদ প্রথা বর্তমান থাকলেও তা উত্তর ভারতের মতো অতটা কঠোর ছিল না। পাল রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তাঁরা নিজেদের জন্য পরমসৌগত উপাধি ব্যবহার করতেন, যাতে বোঝানো হয় তাঁরা বৌদ্ধধর্মের প্রধান রক্ষক ও পৃষ্ঠপোষক। তাঁরা বৌদ্ধধর্মের প্রতি একনিষ্ঠ ছিলেন কিন্তু তাঁরা ধর্মীয় উদারতার নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের শাসনকালে ব্রাহ্মণদের প্রচুর ভূমিদান করা হতো এবং মন্ত্রী বা সেনাপতি হিসেবে ব্রাহ্মণদের নিয়োগ দেওয়া হতো। যেমন, ধর্মপালের মহামন্ত্রী ছিলেন গর্গ এবং দেবপালের মন্ত্রী ছিলেন দর্ভপাণি—উভয়েই ছিলেন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ।[8] এই ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ সমাজে স্থিতিশীলতা এনেছিল। পাল যুগে বৌদ্ধধর্ম এক নতুন রূপ লাভ করে, যা ‘তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম’ বা বজ্রযান নামে পরিচিতি পায়। নালন্দা, বিক্রমশীলা ও সোমপুর মহাবিহারের মতো আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাকেন্দ্রগুলো গড়ে ওঠার ফলে বাংলা সমগ্র এশিয়ায় জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।[9] জাভা ও সুমাত্রার শৈলেন্দ্রবংশীয় রাজা বালপুত্রদেব নালন্দায় একটি মঠ নির্মাণের জন্য দেবপালের কাছে পাঁচটি গ্রাম প্রার্থনা করেছিলেন, যা পাল সাম্রাজ্যের খ্যাতির প্রমাণ দেয়।
অর্থনৈতিক দিক থেকে পাল যুগের বাংলা প্রধানত কৃষিনির্ভর অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।[10] গুপ্ত যুগে বাংলার যে বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি লক্ষ করা যায়, পাল যুগে এসে তা তুলনামূলকভাবে হ্রাস পায়।[11] গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর উত্তর ভারতে দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আঞ্চলিক ক্ষমতার সংঘর্ষ স্থলবাণিজ্যের নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।[12] রোমান সাম্রাজ্যের পতন এবং পশ্চিম এশিয়ার বাণিজ্য কাঠামোর রূপান্তরের ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে পরিবর্তন ঘটে। ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যে বাংলার ভূমিকা সীমিত হয়ে পড়ে।[13] তাম্রলিপ্ত বন্দরের গুরুত্ব ক্রমশ হ্রাস পায়, যা বাংলার সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই সময়ে এসে রৌপ্যমুদ্রার প্রচলন কমে যায় এবং কড়ি ও পণ্যবিনিময় ভিত্তিক অর্থনীতি অধিক গুরুত্ব লাভ করে।[14]
বাণিজ্যের এই মন্দা সত্ত্বেও পাল শাসকেরা কৃষি উৎপাদনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। নদীমাতৃক বাংলায় সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, বনভূমি আবাদ এবং উর্বর পলিমাটির কার্যকর ব্যবহারের ফলে কৃষিভিত্তিক উদ্বৃত্ত সৃষ্টি হয়, যা বৃহৎ সেনাবাহিনী, বৌদ্ধ বিহার এবং প্রশাসনিক কাঠামোর ব্যয় নির্বাহে সহায়ক হয়েছিল।[15] বাংলার কারুশিল্প, বিশেষ করে মৃৎশিল্প (টেরাকোটা) এবং বস্ত্রশিল্প এই সময়ে যথেষ্ট সমৃদ্ধি লাভ করে। পাল যুগের অর্থনীতি গুপ্ত যুগের নগর ও বাণিজ্যনির্ভর কাঠামো থেকে সরে এসে একটি গ্রামীণ, কৃষিভিত্তিক রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়।[16]
পাল সাম্রাজ্যের উত্থান ও সংহতির এই পর্বে বাংলা নিজস্ব একটি সাংস্কৃতিক সত্তা খুঁজে পায়। সংস্কৃত সাহিত্যের পাশাপাশি প্রাকৃত ও অপভ্রংশ ভাষার চর্চা শুরু হয়, যা পরবর্তীতে বাংলা ভাষার উদ্ভবের পথ প্রশস্ত করে। পাল ভাস্কর্য ও চিত্রশিল্পে এক বিশেষ রীতির বিকাশ ঘটে, যা ‘পূর্ব ভারতীয় শিল্পরীতি’ নামে খ্যাত। ধীমান ও বীতপাল ছিলেন এই যুগের কিংবদন্তি শিল্পী।[17]
পরিশেষে বলা যায়, পাল রাজবংশের উত্থান ছিল বাংলার ইতিহাসের এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়। গোপাল যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছিলেন, ধর্মপাল ও দেবপাল তাকে এক সুউচ্চ প্রাসাদে রূপান্তর করেছিলেন। কেবল যুদ্ধ ও রাজনীতি নয়—সমাজ, ধর্ম, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তাঁরা যে উদার ও সংহত নীতি গ্রহণ করেছিলেন, তা-ই পাল সাম্রাজ্যকে প্রায় চারশ বছর টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। অরাজকতার ভস্ম থেকে উঠে আসা বাংলা এই সময়েই প্রথম নিজেকে এক বিশাল সাম্রাজ্যশক্তি হিসেবে ভারতের মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত করে।
Footnotes / References
[1] রাজ্য সীমা: নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদিপর্ব, পৃষ্ঠা: ৩৮৫।
[2] অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা: রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাস (খণ্ড ১), পৃষ্ঠা: ১৬৫–১৬৭।
[3] ওদন্তপুরী মহাবিহার: রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রথম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৫২।
[4] উত্তর ভারতীয় রাজনীতি ও ত্রিশক্তি সংঘর্ষ — রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রথম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৫৪–৫৭।
[5] কনৌজ বিজয় ও রাজদরবার আহ্বান — রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাস (খণ্ড ১), পৃষ্ঠা: ১৭৫–১৭৮।
[6] দেবপালের দিগ্বিজয় ও বাদল স্তম্ভলিপি — নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদিপর্ব, পৃষ্ঠা: ৪১৫–৪১৮।
[7] পাল আমলাতন্ত্র ও প্রশাসনিক কাঠামো — সুকুমার সেন, প্রাচীন বাংলা ও বাঙালী, পৃষ্ঠা: ১৬২–১৬৫।
[8] ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও ব্রাহ্মণ মন্ত্রী — রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাস (খণ্ড ১), পৃষ্ঠা: ১৯০–১৯২।
[9] বৌদ্ধ বিহার ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক — রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রথম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১১৮–১২০।
[10] পাল যুগের কৃষিনির্ভরতা ও ভূমিদান — নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, পৃষ্ঠা: ২০০–২০৫।
[11] গুপ্ত পরবর্তী বাণিজ্যিক রূপান্তর — রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাস (খণ্ড ১), পৃষ্ঠা: ১৪০–১৪৫।
[12] স্থলবাণিজ্যের নিরাপত্তা ও অস্থিরতা: নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদিপর্ব, পৃষ্ঠা: ৪১৫–৪১৮।
[13] তাম্রলিপ্ত বন্দরের পতন ও নৌ-বাণিজ্যের সংকট — রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাস (খণ্ড ১), পৃষ্ঠা: ১৫২–১৫৫।
[14] কড়ি ও বিনিময় ভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতি — সুকুমার সেন, প্রাচীন বাংলা ও বাঙালী, পৃষ্ঠা: ১২০–১২৩।
[15] কৃষি উদ্বৃত্ত ও বৌদ্ধ বিহারের রাজকীয় ভরণপোষণ — নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, পৃষ্ঠা: ২৫০–২৫৫।
[16] গ্রামীণ ও কৃষিভিত্তিক রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি: নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদিপর্ব, পৃষ্ঠা: ২৫০–২৫৫।
[17] পাল যুগের শিল্পকলা ও সংস্কৃতি — নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদিপর্ব, পৃষ্ঠা: ৭৫০–৭৫২।