বাংলার ইতিহাসে ‘মাৎস্যন্যায়’ কেবল একটি অরাজক সময় নয়, এটি ছিল একটি প্রাচীন প্রশাসনিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিলুপ্তি এবং একটি নতুন জাতীয় চেতনার অভ্যুদয়কাল। এই যুগসন্ধিক্ষণের পূর্বাপর নিয়েই আজকের লেখা।
খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মগধের গুপ্ত রাজবংশের কেন্দ্রীয় শাসন শিথিল হয়ে পড়লে বাংলায় স্থানীয় সামন্তদের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। গুপ্ত শাসনের এই অবসান বাংলার সংহতি নষ্ট করে দেয় এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন ভূস্বামীর জন্ম দেয়, যা দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার পথ প্রশস্ত করে।[1] অস্থিতিশীলতার এই পর্যায়ে রাজা শশাঙ্ক গৌড়কে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ নেন। শশাঙ্ক বাংলার বিচ্ছিন্ন জনপদগুলোকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় দিয়েছিলেন, তবে তাঁর শাসন ছিল মূলত যুদ্ধনির্ভর, যা কোনো স্থায়ী রাজনৈতিক কাঠামো রেখে যেতে পারেনি।[2]
৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দের দিকে শশাঙ্কের মৃত্যুর পর গৌড় সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। তাঁর পুত্র মানব সিংহাসনে আরোহণ করলেও তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হন এবং মাত্র ৮ মাস রাজত্ব করেছিলেন। হর্ষবর্ধনের আক্রমণে তিনি নেতৃত্ব ধরে রাখতে ব্যর্থ হলে বাংলা পুনরায় বহুধা বিভক্ত হয়ে পড়ে; এই বিবরণটি মূলত ‘মঞ্জুশ্রীমূলকল্প’ নামক গ্রন্থেও সমর্থিত।[3] চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-এর বিবরণ অনুযায়ী শশাঙ্ক পরবর্তী সময়ে বাংলা পুণ্ড্রবর্ধন, সমতট, তাম্রলিপ্ত, কর্ণসুবর্ণ ও কাজঙ্গল—এই পাঁচটি প্রধান খণ্ডরাজ্যে বিভক্ত ছিল।[4] এই রাজ্যগুলোর মধ্যে কোনো কেন্দ্রীয় সমন্বয় ছিল না। বাংলার এই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগ নেয় প্রতিবেশী শক্তিসমূহ। মগধের আদিত্যসেন এবং পরবর্তীকালে কনৌজের যশোবর্মা ও কাশ্মীরের ললিতাদিত্য বারবার বাংলা আক্রমণ করেন।[5] শুধু উত্তর ভারতের এই শক্তিসমূহ নয়, তিব্বতি আক্রমণও বাংলার জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে।
‘মাৎস্যন্যায়’ পরিভাষাটি মূলত প্রাচীন রাষ্ট্রনীতি থেকে আগত।[6] পুকুরের বড় মাছ যেমন ছোট মাছকে গিলে খায়, শাসকের অনুপস্থিতিতে সমাজে শক্তিমানের হাতে দুর্বলের নির্যাতিত হওয়ার অবস্থাকেই মাৎস্যন্যায় বলা হয়।[7] বাংলার ইতিহাসের অন্ধকারতম যুগ হিসেবে বিবেচিত এমন পরিস্থিতি দেখা দিয়েছিল যেখানে কোনো বিচার বা আইন কার্যকর ছিল না।[8] দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে বাংলার কৃষি ও বাণিজ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এই অরাজকতা কেবল রাজনৈতিক ছিল না, এটি বাংলার সামাজিক কাঠামোকেও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। সামন্তদের অত্যাচারে সাধারণ মানুষের জীবন ছিল চরম অনিরাপদ।[9] তৎকালীন সমাজে শক্তিশালী সামন্ত ও ভূস্বামীরা দণ্ডহীনের সুযোগে দুর্বলের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাত।[10] কৃষিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষরা একদিকে দস্যুদের ভয় এবং অন্যদিকে প্রতিবেশী সামন্তদের লুটের শিকার হতো। আইনের শাসন বলতে কিছুই ছিল না, বরং “জোর যার মুলুক তার”—এই নীতিই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতিতে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ও প্রাণের নিরাপত্তা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।[11] শশাঙ্কের মৃত্যু থেকে পাল বংশের উত্থান পর্যন্ত প্রায় এক শতাব্দী এই অবস্থা চলেছিল।
অরাজকতার চরম পর্যায়ে বাংলার সাধারণ মানুষ ও সমাজের প্রভাবশালী গোষ্ঠী (প্রকৃতিপুঞ্জ) অনুধাবন করেন যে, একটি কেন্দ্রীয় শক্তি ছাড়া এই ধ্বংস থেকে বাঁচার উপায় নেই। এই উপলব্ধি থেকেই বাঙালি জাতি নিজেদের বিবাদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মানসিকতা অর্জন করে।[12] কেবল একজন শক্তিশালী ও সর্বজনগ্রাহ্য শাসকের পক্ষেই এই ধ্বংস থেকে বাংলাকে রক্ষা করা সম্ভব। এই ঐকমত্যের ভিত্তিতেই গোপালকে রাজা নির্বাচিত করা হয়।[13] গোপাল সিংহাসনে আরোহণ করেই প্রথমে বাংলার অভ্যন্তরীণ বিবদমান সামন্তদের বশীভূত করেন এবং একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলেন। খালিমপুর তাম্রশাসনে বর্ণিত “লক্ষ্ম্যাঃ করং গ্রাহিতঃ” কথাটি নির্দেশ করে যে, তিনি কেবল বীরত্বের মাধ্যমে নয়, বরং জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে রাজদণ্ড গ্রহণ করেছিলেন।[14] গোপাল বরেন্দ্র (উত্তর বঙ্গ) ও গৌড় অঞ্চলে তাঁর আধিপত্য সুদৃঢ় করে এক শতাব্দীর বিশৃঙ্খলা ও মাৎস্যন্যায় দূর করেন এবং পাল রাজবংশের প্রায় চারশ বছরের এক গৌরবময় ও দীর্ঘস্থায়ী শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেন।[15] এই রাজনৈতিক সংহতিই পরবর্তীতে তাঁর পুত্র ধর্মপালকে উত্তর ভারতের একচ্ছত্র অধিপতি হওয়ার পথ প্রশস্ত করে দেয়।
মাৎস্যন্যায় ছিল বাংলার ইতিহাসের এক ক্রান্তিকাল। রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর পর কোনো কেন্দ্রীয় শাসন না থাকায় দেশজুড়ে যে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ে, তাকে ঐতিহাসিকরা বাংলার ‘অন্ধকার যুগ’ হিসেবে অভিহিত করেন। এই দীর্ঘ অরাজকতা যেমন ধ্বংস ডেকে এনেছিল, তেমনি এটি বাঙালির মনে প্রথম রাজনৈতিক ঐক্যের বীজ বপন করেছিল। সাধারণ মানুষের সম্মতিতে গোপালের নির্বাচন ছিল বাংলার ইতিহাসে প্রথম সম্মিলিত চেতনার বহিঃপ্রকাশ, যা পরবর্তী চারশ বছরের পাল শাসনের সুদৃঢ় ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।
Footnotes / References:
[1] গুপ্ত-পরবর্তী শাসনভাঙন ও অরাজকতা — সুকুমার সেন, প্রাচীন বাংলা ও বাঙালী, পৃষ্ঠা: ১৪৫–১৫২।
[2] শশাঙ্কের শাসন ও তার রাজনৈতিক গুরুত্ব — রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাস (খণ্ড ১), পৃষ্ঠা: ৯৮–১০৫।
[3] শশাঙ্কের মৃত্যুর পর অরাজকতা ও মানব — সুকুমার সেন, প্রাচীন বাংলা ও বাঙালী, পৃষ্ঠা: ১৪৭-১৫০।
[4] হিউয়েন সাং-এর বিবরণ ও পাঁচ রাজ্যের উল্লেখ — রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাস (খণ্ড ১), পৃষ্ঠা: ১১৬–১২০।
[5] বৈদেশিক আক্রমণ ও বিশৃঙ্খলা — রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রথম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৩৬-৩৮।
[6] অর্থশাস্ত্রে মাৎস্যন্যায় (তাত্ত্বিক ভিত্তি) — নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদিপর্ব, পৃষ্ঠা: ৩৮১।
[7] মাৎস্যন্যায়ের সংজ্ঞা ও অর্থ — নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদিপর্ব, পৃষ্ঠা: ৩৮০।
[8] অরাজকতার অন্ধকারতম যুগ ও বিচারহীনতা — নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদিপর্ব, পৃষ্ঠা: ৩৮০-৩৮২।
[9] সামাজিক বিশৃঙ্খলার গভীরতা — নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদিপর্ব, পৃষ্ঠা: ২২১-২২৫।
[10] জনজীবনের অরাজকতা ও তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট — নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদিপর্ব, পৃষ্ঠা: ৩৮০-৩৮২।
[11] সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক বিলুপ্তি — রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাস (খণ্ড ১), পৃষ্ঠা: ১৫৫-১৬০।
[12] সামন্তদের ঐক্য ও গোপাল — রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাস (খণ্ড ১), পৃষ্ঠা: ১৬৩-১৬৫।
[13] মাৎস্যন্যায়ের অবসান ও পাল শাসন — রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রথম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৩৯-৪০।
[14] গোপালের ক্ষমতা সুসংহতকরণ ও প্রশাসনিক সংহতি — রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রথম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৪১-৪৪।
[15] গোপালের আধিপত্য ও পাল বংশের ভিত্তি — রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাস (খণ্ড ১), পৃষ্ঠা: ১৬৩-১৬৮।

