”Hard times create strong men. Strong men create good times. Good times create weak men. And weak men create hard times.”
জি. মাইকেল হফের এই বিখ্যাত উক্তিটি আমরা অনেকেই শুনেছি। কিন্তু বাংলার ইতিহাসের সাথে এর সম্পর্ক কোথায়? সম্পর্ক গভীর। বাংলার চরম অরাজকতার কাল (মাৎস্যন্যায়) পার করে গোপালের মতো একজন ‘স্ট্রং ম্যান’ যখন একটি শক্ত ভিত্তি দাঁড় করিয়ে দেন, তখন থেকেই শুরু হয় পাল বংশের জয়যাত্রা। তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি ধর্মপাল এবং দেবপাল তাঁর মতোই শক্তিশালী শাসক ছিলেন। তাঁরা বাংলাকে নিয়ে যান সমৃদ্ধির স্বর্ণযুগে। কিন্তু এই ‘গুড টাইম’ বা স্বর্ণযুগেই কেন পরবর্তী প্রজন্মের শাসকরা ‘উইক ম্যান’ হয়ে উঠলেন? এখানে ‘উইক ম্যান’ বলতে ব্যক্তিগত চরিত্রের দুর্বলতা নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় সামরিক ও প্রশাসনিক দৃঢ়তার অভাবকে বোঝানো হয়েছে। বাংলায় পাল সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ এবং এর সাথে পাল রাজাদের পরিবর্তন নিয়েই আজকের লেখা।
পাল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে দেবপালের মৃত্যুর পর থেকে নারায়ণপালের সিংহাসন আরোহণ পর্যন্ত সময়কালটি (আনুমানিক ৮৫০–৮৬০ খ্রিস্টাব্দ) অত্যন্ত ধোঁয়াশাপূর্ণ এবং বিতর্কিত। দীর্ঘকাল ঐতিহাসিকরা মনে করতেন দেবপালের পর সরাসরি বিগ্রহপাল রাজা হয়েছিলেন, কিন্তু আধুনিক গবেষণায় মহেন্দ্রপাল (রাজত্বকাল আনুমানিক ৮৫০–৮৫৪ খ্রিস্টাব্দ) নামক এক শক্তিশালী শাসকের অস্তিত্ব আধুনিক গবেষণায় প্রতীয়মান হয়েছে। দীর্ঘদিন যাবৎ মহেন্দ্রপালকে গুর্জর-প্রতিহার বংশের রাজা মনে করা হতো। কিন্তু ‘জগজীবনপুর তাম্রশাসন’ (১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে আবিষ্কৃত) ধারণার আমূল পরিবর্তন এনেছে। দেবপালের কোনো পুত্র ছিল কিনা তা নিয়ে আগে সংশয় ছিল, কিন্তু জগজীবনপুর লিপি অনুযায়ী মহেন্দ্রপাল ছিলেন দেবপালের পুত্র এবং তাঁর উত্তরসূরি।[1] দেবপালের তৈরি বিশাল সাম্রাজ্য মহেন্দ্রপাল অন্তত কয়েক বছরের জন্য অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছিলেন। তাঁর শাসনামলে উত্তরবঙ্গ (পুন্ড্রবর্ধন) এবং বিহারের ওপর পালের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল। তিনি বৌদ্ধধর্মের একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং তাঁর সময়েই বৈশাখী পূর্ণিমা উপলক্ষে বিশেষ উৎসব ও বিহারে ভূমিদানের প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে তাঁর অকাল মৃত্যু বা পদত্যাগ পাল বংশে এক অস্থিরতার সূচনা করে।
মহেন্দ্রপালের পর বা সমসাময়িক সময়ে সিংহাসনে বসেন বিগ্রহপাল (যিনি প্রথম বিগ্রহপাল নামে পরিচিত)। তিনি ছিলেন দেবপালের ভাই জয়পালের পুত্র। বিগ্রহপাল (রাজত্বকাল আনুমানিক ৮৫৪ খ্রিস্টাব্দ) লড়াকু যোদ্ধা ছিলেন না; বরং ঐতিহাসিকদের মতে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ও সংসারবিমুখ।[2] মাত্র কয়েক বছর (মতান্তরে কয়েক মাস) রাজত্ব করার পর তিনি তাঁর পুত্র নারায়ণপালের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁর এই দুর্বল বা স্বল্পস্থায়ী শাসনের সুযোগেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রকুট ও প্রতিহাররা পাল সীমান্তে হানা দিতে শুরু করে। তাঁর সময়েই পালদের কেন্দ্রীয় শাসন প্রথমবারের মতো কিছুটা নড়বড়ে হয়ে পড়ে। দেবপালের যে প্রতাপ ছিল, বিগ্রহপালের বৈরাগ্যের কারণে তা ম্লান হতে শুরু করে।[3]
এই ১০ বছরের ছোট কালখণ্ডে পাল সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। কেন্দ্রীয় শক্তির কিছুটা শিথিলতার সুযোগে স্থানীয় সামন্তরা (যেমন লল্ল ও স্তম্ভ) অধিক শক্তিশালী হতে শুরু করে। এটি পালদের জন্য আশীর্বাদ ও অভিশাপ উভয়ই ছিল—আশীর্বাদ কারণ তারা সীমান্ত রক্ষা করত, অভিশাপ কারণ তারা মাঝে মাঝে বিদ্রোহী হয়ে উঠত। এই সময়েও পাল আমলের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ছিল কৃষি। নদীমাতৃক বাংলার পলিমাটি রাজকোষকে সচল রেখেছিল। তবে বিগ্রহপালের সময় যুদ্ধে কম মনোযোগ দেওয়ায় সামরিক ব্যয় কিছুটা কমেছিল এবং ধর্মীয় অনুদান বৃদ্ধি পেয়েছিল।[4] এই স্বল্পস্থায়ী দুই শাসনের সময়েও পাল শিল্পরীতি বা ‘Eastern Indian School of Art’ থমকে যায়নি। দেবপালের আমলের সেই কালো পাথরের ধ্রুপদী মূর্তিনির্মাণ অব্যাহত ছিল। বুদ্ধ ও বোধিসত্ত্বের মূর্তিতে শান্ত ভাব এবং অলঙ্করণের আধিক্য দেখা যায়। মহেন্দ্রপালের সময় বেশ কিছু ছোট বৌদ্ধ স্তূপ ও মন্দির বিহারে নির্মিত হয়েছিল। নালন্দার ওপর পালদের নিয়ন্ত্রণ এই সময়েও অত্যন্ত সুদৃঢ় ছিল।[5]
মহেন্দ্রপাল ও বিগ্রহপালের রাজত্বকাল ছিল পাল সাম্রাজ্যের ‘সংকট ও উত্তরণ’-এর সন্ধিক্ষণ। মহেন্দ্রপাল যদি আরও দীর্ঘকাল রাজত্ব করতে পারতেন, তবে হয়তো পরবর্তী প্রতিহার আক্রমণ মোকাবিলা করা পালদের জন্য সহজ হতো। বিগ্রহপালের সন্ন্যাস গ্রহণ পাল রাজবংশের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা, যা তাঁদের বৌদ্ধ অহিংসা নীতির গভীর প্রভাবকে স্পষ্ট করে।
দেবপালের মৃত্যুর পর মহেন্দ্রপাল ও বিগ্রহপালের রাজত্বকাল পেরিয়ে যখন নারায়ণপাল (রাজত্বকাল আনুমানিক ৮৫৪–৯০৮ খ্রিস্টাব্দ) সিংহাসনে বসেন, তখন একদিকে পালদের জৌলুস যেমন মধ্যগগনে ছিল, ঠিক তখনই সাম্রাজ্যের পতনের সূক্ষ্ম রেখাগুলোও স্পষ্ট হতে শুরু করে। দেবপালের আমলে পাল সাম্রাজ্য হিমালয় থেকে বিন্ধ্যা পর্বত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারী নির্বাচনের সংকট এবং রাষ্ট্রকুট ও প্রতিহারদের বারবার আক্রমণ পালদের শক্তিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।
নারায়ণপাল দীর্ঘ ৫৪ বছর রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর রাজত্বের শুরুতে পালদের আধিপত্য বজায় থাকলেও শেষের দিকে প্রতিহার রাজা ভোজ এবং প্রথম মহেন্দ্রপাল বাংলার উত্তর ও পশ্চিম অংশ দখল করে নেন।[6] তিনি যুদ্ধবিগ্রহের চেয়ে শান্তির প্রতি অধিক অনুরাগী ছিলেন, যা সামরিকভাবে পালদের কিছুটা দুর্বল করে দেয়। এই সময়ে কেন্দ্রীয় শক্তি শিথিল হতে শুরু করলে কামরূপ (আসাম) এবং ওড়িশার মতো সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো পালদের করদ রাজ্য থেকে বেরিয়ে স্বাধীন হওয়ার চেষ্টা করে।
পাল রাজাদের এই সময়কালকে বাংলার সামাজিক ‘সিম্বায়োসিস’ বা সমন্বয়ের স্বর্ণযুগ বলা হয়। নারায়ণপাল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সময়কালে শৈব ও বৈষ্ণব ধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটে। নারায়ণপালের ভাগলপুর তাম্রশাসনে উল্লেখ আছে যে, তিনি শিব মন্দিরের জন্য ভূমি দান করেছিলেন এবং নিজে ‘পশুপতি’ শিবের উপাসক ব্রাহ্মণদের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।[7] বৌদ্ধ বিহারগুলো (যেমন নালন্দা ও সোমপুর) কেবল সন্ন্যাসীদের কেন্দ্র ছিল না, বরং সাধারণ মানুষের জীবনচর্চাতেও গভীর প্রভাব ফেলত। সমাজে জাতপাতের কড়াকড়ি থাকলেও বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে তা দক্ষিণ ভারতের মতো কঠোর ছিল না।[8]
পাল আমলের অর্থনীতির ভিত্তি ছিল বাংলার উর্বর পলিমাটি, তবে নারায়ণপালের সময় বাণিজ্যের ধরণ কিছুটা পরিবর্তিত হয়। ভূমিদান প্রথার মাধ্যমে কৃষিকাজের বিস্তার ঘটানো হয়। রাষ্ট্রের আয়ের প্রধান উৎস ছিল উৎপন্ন ফসলের ষষ্ঠাংশ, যা ‘ভাগ’ নামে পরিচিত ছিল।[9] যদিও উত্তর ভারতে প্রতিহারদের সাথে লড়াইয়ের ফলে স্থলপথের বাণিজ্য কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছিল, কিন্তু নদীপথ এবং বঙ্গোপসাগরের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে বাণিজ্য অব্যাহত ছিল। সমকালীন আরব পর্যটকদের বিবরণ অনুযায়ী, বাংলার মসলিন এবং সুতির কাপড় তখন বিশ্ববিখ্যাত ছিল।
নারায়ণপালের সময়ে পাল শিল্পরীতি তার নিজস্ব ও স্বকীয় রূপ লাভ করে। কালো কষ্টিপাথরের মূর্তিনির্মাণের যে ধারা ধর্মপাল শুরু করেছিলেন, তা নারায়ণপালের সময় আরও সূক্ষ্ম ও অলংকৃত হয়ে ওঠে। দেব-দেবীর মূর্তির গয়না ও পোশাকের ডিটেইলিং এই সময়ের ভাস্কর্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য।[10] এই সময়েই তালপাতার পুথিচিত্রের (Manuscript Painting) সূচনা ঘটে। ‘অষ্টসহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা’র মতো পুথিতে ব্যবহৃত রঙ ও রেখাচিত্র বাংলার চিত্রকলার আদি নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত।
নারায়ণপালের রাজত্বকালকে বলা হয় পালদের ‘মধ্যবর্তী সংকটকাল’। এই সময়েই কম্বোজ ও চন্দ্রেয়দের উত্থান ঘটে, যারা পরবর্তীকালে পালদের হাত থেকে বাংলার একাংশ কেড়ে নিয়েছিল। তবুও পাল রাজারা এই সময়ে তাঁদের সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের মাধ্যমে বাংলাকে ভারতের এক অনন্য জ্ঞানকেন্দ্র এবং স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের উন্নত রাজ্যে পরিণত করে রেখেছিলেন।
Footnotes / References
[1] আধুনিক গবেষণা ও আবিষ্কার: কে. ভি. রমেশ এবং এস. পি. তেওয়ারি, Jagjibanpur Copper-plate of Mahendrapala।
[2] বিগ্রহপালের বৈরাগ্য ও উত্তরাধিকার: রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ), পৃষ্ঠা: ৮০-৮২।
[3] দেবপাল-উত্তর উত্তরাধিকার দ্বন্দ্ব: রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাস (প্রথম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২০৫-২০৮।
[4] পাল আমলের মধ্যবর্তী সংকটকাল: নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস (আদিপর্ব), পৃষ্ঠা: ৩৯৮-৪০২।
[5] পাল যুগের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিবর্তন: সুকুমার সেন, প্রাচীন বাংলা ও বাঙালী, পৃষ্ঠা: ১৭০-১৭৪।
[6] নারায়ণপালের পরাজয় ও প্রতিহার আক্রমণ: রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ), পৃষ্ঠা: ৮০-৮৫।
[7] নারায়ণপালের ভাগলপুর তাম্রশাসন ও ধর্মীয় নীতি: রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাস (প্রথম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২১০-২১৫।
[8] পাল আমলের সামাজিক বিবর্তন: নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস (আদিপর্ব), পৃষ্ঠা: ৪০৫-৪১০।
[9] পাল আমলের ভূমি ব্যবস্থা ও অর্থনীতি: বিনয় ঘোষ, বাংলার সামাজিক ইতিহাসের ধারা, পৃষ্ঠা: ১০০-১০৫।
[10] পাল যুগের শিল্প ও সংস্কৃতি: সুকুমার সেন, প্রাচীন বাংলা ও বাঙালী, পৃষ্ঠা: ১৭৫-১৮০।