প্রতিটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য তার চরম শক্তি আর গৌরবের মধ্যেই শেষের সূচনা বহন করে; পাল সাম্রাজ্যের ইতিহাসও এর ব্যতিক্রম নয়। একসময় উত্তর ভারতের রাজনীতিতে দাপট দেখানো এই রাজবংশের উচ্চশিখরে পৌঁছানোর পরপরই পরবর্তী প্রজন্মের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা আর সামন্তদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ফাটল ধরাতে শুরু করে। পাল সাম্রাজ্যের সেই গৌরবময় মধ্যগগন থেকে শেষ সূর্যাস্ত এবং বাংলার রাজনৈতিক পরিবর্তনের এই বিয়োগান্তক অধ্যায় নিয়েই আজকের লেখা।
নারায়ণপালের দীর্ঘ শাসনের পর তাঁর পুত্র রাজ্যপাল (রাজত্বকাল আনুমানিক ৯০৮–৯৪০ খ্রিস্টাব্দ) পাল সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর প্রায় ৩২ বছরের শাসনামল ছিল পাল সাম্রাজ্যের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের একটি প্রচেষ্টা। রাজ্যপালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন। তিনি রাষ্ট্রকূট রাজকন্যা ভাগ্যদেবীকে বিবাহ করেন, যা উত্তর ভারতে পালদের অবস্থানকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করেছিল। তাঁর সময়ে বরেন্দ্র ও মগধ অঞ্চলে পালদের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত হয় এবং তিনি বেশ কিছু জনহিতকর কাজ ও জলাশয় খনন করেছিলেন।[1]
রাজ্যপালের পর তাঁর পুত্র দ্বিতীয় গোপাল (রাজত্বকাল আনুমানিক ৯৪০–৯৬০ খ্রিস্টাব্দ) রাজত্ব করেন। তাঁর সময় থেকেই পাল সাম্রাজ্যের ওপর অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক চাপের লক্ষণগুলো প্রকট হতে শুরু করে। মগধের ওপর তাঁর আধিপত্য বজায় থাকলেও বাংলার উত্তর ও পশ্চিম অংশে কাম্বোজ ও কলচুরিদের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় সাম্রাজ্যের ভিত্তি কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয় গোপালের পর তাঁর পুত্র দ্বিতীয় বিগ্রহপাল (রাজত্বকাল আনুমানিক ৯৬০–৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ) ক্ষমতায় আসেন। তাঁর রাজত্বকাল ছিল পাল বংশের ইতিহাসের অন্যতম সংকটাপূর্ণ সময়। এই সময়ে উত্তর ও পশ্চিম বাংলায় তিব্বতি বংশোদ্ভূত কাম্বোজ রাজারা শক্তিশালী হয়ে ওঠেন এবং পালদের হাত থেকে উত্তর বঙ্গের এক বিশাল অংশ কেড়ে নেন। দ্বিতীয় বিগ্রহপালের ক্ষমতা মূলত পূর্ব বাংলা এবং মগধের কিছু অংশে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। বৈদেশিক আক্রমণ এবং আঞ্চলিক সামন্তদের বিদ্রোহের ফলে পাল সাম্রাজ্য প্রায় ধ্বংসের মুখে পৌঁছেছিল।[2]
এই চরম অরাজকতা ও বিপর্যয়ের পর ৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় বিগ্রহপালের পুত্র প্রথম মহীপাল সিংহাসনে আরোহণ করেন, যিনি পাল সাম্রাজ্যকে পুনর্গঠিত করে বংশের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনেন।
দ্বিতীয় বিগ্রহপালের পর তাঁর পুত্র প্রথম মহীপাল (রাজত্বকাল আনুমানিক ৯৮৮–১০৩৮ খ্রিস্টাব্দ) পাল সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর শাসনকাল পাল রাজবংশের ইতিহাসে এক সংকটপূর্ণ সময়। দীর্ঘদিনের অরাজকতা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বৈদেশিক আক্রমণের ফলে পাল সাম্রাজ্য যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ছিল, তখন মহীপাল তাঁর অসামান্য সামরিক দক্ষতা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে সাম্রাজ্যকে পুনর্জীবিত করেন। এইজন্য তাঁকে পাল সাম্রাজ্যের ‘দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা’ বলা হয়।[3]
মহীপাল সিংহাসনে বসেই তাঁর প্রধান লক্ষ্য স্থির করেন হারানো রাজ্য পুনরুদ্ধার। সারনাথ লিপি ও বাণগড় তাম্রশাসন থেকে জানা যায়, তিনি উত্তর ও পশ্চিম বাংলা থেকে কাম্বোজদের বিতাড়িত করে বরেন্দ্র ও গৌড় অঞ্চল পুনর্দখল করেন।[4] এরপর তিনি পূর্ব বাংলার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। পাল সাম্রাজ্যের সীমানা উত্তর ও পূর্ব বাংলা ছাড়িয়ে মগধ (বিহার) এবং বারাণসী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। তাঁর এই বিশাল রাজ্য জয়ের ফলে পালরা পুনরায় উত্তর ভারতের রাজনীতিতে একটি প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়। মহীপালের রাজত্বকালে দক্ষিণ ভারতের শক্তিশালী চোল রাজা রাজেন্দ্র চোল বাংলা আক্রমণ করেন (১০২১-১০২৪ খ্রিস্টাব্দ)। চোল সেনাবাহিনী গঙ্গা তীরবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছেছিল। যদিও এই যুদ্ধে মহীপাল সাময়িকভাবে পর্যুদস্ত হন, কিন্তু রাজেন্দ্র চোল স্থায়ীভাবে বাংলা দখল করতে পারেননি। রাজেন্দ্র চোলের প্রত্যাবর্তনের পর মহীপাল দ্রুত তাঁর হারানো অঞ্চলগুলো পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন। এ ছাড়াও পশ্চিম দিক থেকে কলচুরি রাজা গাঙ্গেয়দেবের আক্রমণকেও তিনি প্রতিহত করেছিলেন।[5]
মহীপাল কেবল একজন শ্রেষ্ঠ যোদ্ধাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রজাবৎসল শাসক। বাংলার জনমানসে তাঁর স্মৃতি আজও অম্লান হয়ে আছে। তিনি অসংখ্য দিঘি খনন করিয়েছিলেন, যার মধ্যে দিনাজপুর ও মুর্শিদাবাদের ‘মহীপাল দিঘি’ আজও তাঁর নামে পরিচিত। তিনি পাল আমলের অনেক প্রাচীন মন্দির ও বৌদ্ধ বিহার সংস্কার করেছিলেন। বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তীর্থস্থান সারনাথে তিনি বেশ কিছু ধর্মীয় ইমারত নির্মাণ ও সংস্কার করেন।[6] বাংলার লোকসংগীত ও লোকগাঁথায় মহীপালের নাম অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। ‘মহীপালের গান’ একসময় বাংলার গ্রামগঞ্জে জনপ্রিয় ছিল। কথিত আছে, তাঁর সময়ে কৃষিকাজে ব্যাপক উন্নতি হয়েছিল এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ছিল স্বাচ্ছন্দ্যময়।[7] প্রবাদপ্রতিম বাক্য ‘ধান ভানতে শিবের গীত’-এর মতো ‘ধান ভানতে মহীপালের গীত’ বাক্যটিও তাঁর জনপ্রিয়তার প্রমাণ দেয়।
প্রথম মহীপাল ছিলেন পাল বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নরপতি। তিনি যদি সঠিক সময়ে হাল না ধরতেন, তবে পাল রাজবংশের ইতিহাস হয়তো দশম শতাব্দীতেই সমাপ্ত হয়ে যেত। তাঁর ৫০ বছরের দীর্ঘ ও গৌরবময় শাসনকাল পাল সাম্রাজ্যকে আরও দেড়শ বছর টিকে থাকার শক্তি ও রসদ জুগিয়েছিল।
প্রথম মহীপালের মৃত্যুর পর পাল সাম্রাজ্য পুনরায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং শক্তিশালী সামন্তদের বিদ্রোহের সম্মুখীন হয়। এই পর্বটি পাল রাজবংশের রাজনৈতিক পতনের এক করুণ ইতিহাস, যা চূড়ান্ত পর্যায়ে ‘কৈবর্ত বিদ্রোহ’ নামে এক গণ-অভ্যুত্থানের রূপ নেয়।
প্রথম মহীপালের পর তাঁর পুত্র নয়পাল (রাজত্বকাল আনুমানিক ১০৩৮–১০৫৪ খ্রিস্টাব্দ) সিংহাসনে বসেন। তাঁর শাসনামলের প্রধান উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো কলচুরি রাজা গাঙ্গেয়দেবের পুত্র লক্ষ্মীকর্ণের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ। লক্ষ্মীকর্ণ অন্তত দুবার বাংলা আক্রমণ করেছিলেন এবং অঙ্গ (আধুনিক ভাগলপুর) অঞ্চল দখল করে নেন। তবে প্রখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত অতিশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের মধ্যস্থতায় পাল ও কলচুরিদের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। নয়পাল ধর্মপ্রাণ শাসক ছিলেন এবং তাঁর সময়ে তিব্বতের সঙ্গে পাল সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছিল।[8]
নয়পালের পর তাঁর পুত্র তৃতীয় বিগ্রহপাল (রাজত্বকাল আনুমানিক ১০৫৪–১০৭৫ খ্রিস্টাব্দ) সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর শাসনকালে পাল সাম্রাজ্যের ভাঙন আরও ত্বরান্বিত হয়। একদিকে কলচুরি রাজা লক্ষ্মীকর্ণের আক্রমণ এবং অন্যদিকে পূর্ব বাংলায় বর্মন রাজবংশের উত্থান পালদের কর্তৃত্বকে ম্লান করে দেয়। যদিও বিগ্রহপাল লক্ষ্মীকর্ণের কন্যা যৌবনশ্রীকে বিবাহ করে একটি বৈবাহিক মৈত্রী স্থাপন করেছিলেন, তবুও সাম্রাজ্যের সীমানা উত্তরোত্তর সঙ্কুচিত হতে থাকে। তাঁর রাজত্বকালেই পাল সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ শাসনে শিথিলতা দেখা দেয় এবং সামন্ত রাজারা স্বাধীন হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।[9]
তৃতীয় বিগ্রহপালের মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র দ্বিতীয় মহীপাল সিংহাসনে বসেন। তিনি ছিলেন অবিবেচক ও উগ্র স্বভাবের শাসক। তিনি তাঁর দুই ভাই শূরপাল ও রামপালকে কারাগারে বন্দী করেন, যা রাজপরিবারের ভেতর চরম অসন্তোষ সৃষ্টি করে। তাঁর এই দুর্বল ও অত্যাচারী শাসনের সুযোগ নিয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলের (উত্তর বঙ্গ) শক্তিশালী সামন্ত নেতা দিব্য (বা দিব্বোক)-এর নেতৃত্বে কৈবর্ত জাতি বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ইতিহাসে এটিই বিখ্যাত ‘কৈবর্ত বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত।[10]
মহীপাল তাঁর মন্ত্রীদের পরামর্শ উপেক্ষা করে এক ক্ষুদ্র সেনাবাহিনী নিয়ে বিদ্রোহীদের দমন করতে যান এবং যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন। এর ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলে পাল শাসনের অবসান ঘটে এবং কৈবর্তদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। দিব্যর পর তাঁর ভাই রুদোক এবং পরবর্তীতে তাঁর পুত্র ভীম বরেন্দ্রর শাসক হন। মহীপালের এই পরাজয় পাল সাম্রাজ্যকে কেবল মগধ ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছিল।[11]
কৈবর্ত বিদ্রোহ কেবল একটি সামরিক বিদ্রোহ ছিল না; এটি ছিল পাল শাসনের বিরুদ্ধে এক প্রকার গণ-অভ্যুত্থান। এই ঘটনার ফলে পাল রাজবংশের কেন্দ্রীয় শক্তি ভেঙে পড়ে এবং বাংলার রাজনীতিতে সামন্ততন্ত্রের প্রভাব চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। পরবর্তীতে দ্বিতীয় মহীপালের ভাই রামপাল অনেক সংগ্রামের পর পুনরায় বরেন্দ্র পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
১০৭৫ খ্রিস্টাব্দে কৈবর্ত বিদ্রোহে দ্বিতীয় মহীপালের মৃত্যুর পর পাল সাম্রাজ্য এক অভূতপূর্ব সংকটের সম্মুখীন হয়। এই দুই বছর (১০৭৫-১০৭৭ খ্রিস্টাব্দ) ছিল পাল রাজবংশের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের সময়। বরেন্দ্র অঞ্চলে তখন কৈবর্ত নেতা দিব্য নিজের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। অন্যদিকে, দ্বিতীয় মহীপালের দুই ভাই শূরপাল ও রামপাল তখনও কারাগারে বন্দী ছিলেন। মহীপালের মৃত্যুর পর জেলখানা থেকে মুক্তি পেয়ে তাঁরা মগধের দিকে পালিয়ে যান।[12]
এই সময়ে পালদের কেন্দ্রীয় শাসন প্রায় ভেঙে পড়েছিল। মগধ ও অঙ্গ অঞ্চলের কিছু অংশ ছাড়া পালদের আর কোনো প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ছিল না। পাল রাজবংশের অনুগত সামন্তরা এই অরাজকতার সুযোগে স্বাধীন হওয়ার চেষ্টা করছিল। শূরপাল (দ্বিতীয়) কিছুদিনের জন্য পাল সিংহাসনে বসলেও তিনি সাম্রাজ্যের হৃত গৌরব বা ভূমি পুনরুদ্ধারে ব্যর্থ হন। এই দুই বছর ছিল মূলত দিকভ্রান্ত পাল শক্তির আত্মগোপন ও নতুন করে শক্তি সঞ্চয়ের প্রস্তুতিকাল।[13]
১০৭৭ খ্রিস্টাব্দে শূরপালের পর তাঁর অনুজ রামপাল (রাজত্বকাল আনুমানিক ১০৭৭–১১২০ খ্রিস্টাব্দ) পাল সাম্রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন। তিনি যখন সিংহাসনে বসেন, তখন তাঁর হাতে কোনো শক্তিশালী সেনাবাহিনী বা বিশাল ভূখণ্ড ছিল না। তাঁর পৈত্রিক ভূমি বরেন্দ্র তখন কৈবর্ত শাসক ভীমের (দিব্যর উত্তরসূরি) দখলে।
রামপাল বুঝতে পেরেছিলেন যে, কেবল নিজস্ব শক্তি দিয়ে বরেন্দ্র পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। তাই তিনি তাঁর সিংহাসন পুনরুদ্ধারের জন্য এক দীর্ঘ ও কঠিন কূটনৈতিক মিশন শুরু করেন। তিনি তাঁর মাতুল রাষ্ট্রকূট রাজপুত্র মথন বা মহন-এর সহায়তায় উত্তর ও পূর্ব ভারতের বিভিন্ন সামন্ত রাজাদের দ্বারে দ্বারে যান। সান্ধ্যকর নন্দীর ‘রামচরিতম’ কাব্য অনুযায়ী, রামপাল সামন্তদের তুষ্ট করার জন্য অকাতরে ভূমি ও ধনরত্ন দান করার প্রতিশ্রুতি দেন।[14]
অবশেষে তিনি চতুর্দশ (১৪ জন) শক্তিশালী সামন্ত রাজাদের নিয়ে একটি বিশাল সামরিক জোট গঠন করতে সক্ষম হন। এই সামন্তদের মধ্যে পীঠির ভীমযশ, দণ্ডভুক্তির জয়সিংহ এবং বিক্রমরাজ ছিলেন উল্লেখযোগ্য। নিজের হৃত ভূমি থেকে একপ্রকার নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে রামপাল এক বিশাল বাহিনী নিয়ে গঙ্গা নদী পার হয়ে বরেন্দ্র আক্রমণ করেন। উত্তর বাংলার রণক্ষেত্রে পাল জোটের সঙ্গে কৈবর্ত রাজা ভীমের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে ভীম বন্দী ও নিহত হন। দীর্ঘ নির্বাসন ও সংগ্রামের পর রামপাল তাঁর পিতৃভূমি বরেন্দ্র পুনরুদ্ধার করেন এবং পাল শাসনের দীপশিখাকে পুনরায় প্রজ্বলিত করেন।[15]
বিজয়ের পর রামপাল বরেন্দ্র অঞ্চলে তাঁর নতুন রাজধানী ‘রামাবতী’ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল না, বরং শিক্ষা ও শিল্পের এক নতুন পীঠস্থান হিসেবে গড়ে উঠেছিল। তাঁর এই সফল প্রত্যাবর্তন পাল সাম্রাজ্যকে আরও কয়েক দশকের জন্য স্থিতিশীলতা প্রদান করেছিল।[16]
১১২০ খ্রিস্টাব্দে রামপালের মৃত্যুর পর পাল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শক্তি দ্রুত ভেঙে পড়তে শুরু করে। তাঁর পরবর্তী শাসকরা অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ এবং ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক আক্রমণ ঠেকাতে ব্যর্থ হন।
রামপালের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র কুমারপাল (রাজত্বকাল আনুমানিক ১১২০–১১২৫ খ্রিস্টাব্দ) সিংহাসনে বসেন। তাঁর রাজত্বকালেই কামরূপে (আসাম) বিদ্রোহ দেখা দেয়। যদিও তাঁর মন্ত্রী বৈদ্যদেব এই বিদ্রোহ দমন করেছিলেন, কিন্তু এই ঘটনা পালদের সামরিক দুর্বলতাকে প্রকট করে তোলে। দক্ষিণ দিক থেকে উড়িষ্যার অনন্তবর্মণ চোড়গঙ্গও পাল সাম্রাজ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেন।[17]
কুমারপালের পর তাঁর নাবালক পুত্র তৃতীয় গোপাল (রাজত্বকাল আনুমানিক ১১২৫–১১৪৪ খ্রিস্টাব্দ) সিংহাসনে বসেন। ‘রামচরিতম’ অনুযায়ী, তিনি এক দুর্ঘটনায় বা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর সময়ে পাল সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে এবং সামন্ত রাজারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে শুরু করেন।
পাল বংশের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ রাজা ছিলেন মদনপাল (রাজত্বকাল আনুমানিক ১১৪৪–১১৬২ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি পাল সাম্রাজ্যকে রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সময়েই দক্ষিণ দিক থেকে আসা কর্ণাটকী বংশোদ্ভূত সেন রাজবংশের উত্থান ঘটে। বিজয় সেন ক্রমশ দক্ষিণ ও পূর্ব বাংলা দখল করে উত্তর বাংলার দিকে অগ্রসর হন। মদনপালের রাজত্বকালের শেষের দিকে পালদের শাসন কেবল বিহারের মগধ অঞ্চলের একটি ছোট অংশে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ১১৬২ খ্রিস্টাব্দের দিকে পাল বংশের রাজকীয় ক্ষমতা কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায়।[18]
রামপালের পর যোগ্য নেতৃত্বের অভাব ছিল পাল সাম্রাজ্যের পতনের প্রধান কারণ। যদিও রামপাল বরেন্দ্র উদ্ধার করেছিলেন, কিন্তু সামন্তদের ওপর তাঁর নির্ভরশীলতা রাজকীয় ক্ষমতাকে খর্ব করেছিল। সেনরা সামরিকভাবে পালদের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং একে একে পালদের অঞ্চলগুলো গ্রাস করে। গাহড়বাল ও কলচুরিদের ক্রমাগত আক্রমণ পালদের অর্থনৈতিক ও সামরিক ভিত্তি দুর্বল করে দিয়েছিল।[19]
পালদের স্থলাভিষিক্ত হয় সেন রাজবংশ। পালরা ছিল দীর্ঘস্থায়ী এবং স্থানীয়ভাবে শিকড়যুক্ত, কিন্তু সেনরা ছিল বহিরাগত (দাক্ষিণাত্য থেকে আগত)। সেনরা সমগ্র বাংলায় একটি অত্যন্ত কঠোর এবং কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করে। পাল আমলের নমনীয় সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান ঘটে।[20]
পাল রাজারা ছিলেন বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক। তাঁদের পতনের পর বাংলায় বৌদ্ধধর্ম রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা হারায়। সেন রাজারা ছিলেন গোঁড়া ব্রাহ্মণ্য ধর্মাবলম্বী। ফলে বাংলায় পুনরায় বৈদিক ও পৌরাণিক হিন্দুধর্মের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বৌদ্ধ বিহারগুলো জৌলুস হারায় এবং অনেক বৌদ্ধ পণ্ডিত তিব্বত বা নেপালে চলে যান।[21]
সেন শাসনামলে বাংলায় বর্ণাশ্রম ও জাতিভেদ প্রথা অত্যন্ত কঠোর রূপ লাভ করে। পাল আমলে সমাজে যে একপ্রকার ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও উদারতা ছিল, সেন যুগে তা অনেকাংশে হ্রাস পায়। ‘বল্লাল চরিত’ অনুযায়ী, কৌলিন্য প্রথার প্রবর্তন সমাজকে বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত করে ফেলে।[22]
পাল আমলের চিত্ররীতি ও ভাস্কর্যের যে ‘পূর্ব ভারতীয় শিল্পরীতি’ বিকশিত হয়েছিল, সেন যুগে তাতে কিছুটা পরিবর্তন আসে। সেন আমলের শিল্পে অলংকরণ ও দেব-দেবীর মূর্তির প্রাধান্য বাড়ে। সংস্কৃত সাহিত্যের প্রভূত উন্নতি ঘটে (যেমন: জয়দেবের গীতগোবিন্দম), তবে পাল আমলের তান্ত্রিক বৌদ্ধ সাহিত্যের চর্চা কমে যায়।
পাল সাম্রাজ্যের পতন কেবল একটি রাজবংশের অবসান ছিল না, এটি ছিল বাংলার চারশ বছরের বৌদ্ধ ঐতিহ্যের শাসনের পরিসমাপ্তি। এরপর সেনদের হাত ধরে বাংলা এক নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বলয়ে প্রবেশ করে, যা পরবর্তীতে তুর্কি আক্রমণের পথ প্রশস্ত করেছিল।
Footnotes / References
[1] পাল-রাষ্ট্রকূট সম্পর্ক ও রাজ্যপালের শাসন: রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাস (খণ্ড ১), পৃষ্ঠা: ১৯৫–১৯৮।
[2] কাম্বোজদের উত্থান ও দ্বিতীয় বিগ্রহপালের সংকট: রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রথম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৬৪–৬৬।
[3] মহীপালের সিংহাসন আরোহণ ও পুনর্জাগরণ: রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রথম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৬৮।
[4] বরেন্দ্র ও গৌড় পুনরুদ্ধার: রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাস (খণ্ড ১), পৃষ্ঠা: ২১০–২১৫।
[5] রাজেন্দ্র চোলের আক্রমণ ও পাল সাম্রাজ্য: নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদিপর্ব, পৃষ্ঠা: ৪৩০–৪৩৫।
[6] সারনাথ লিপি ও স্থাপত্যকীর্তি: রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রথম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৭২।
[7] মহীপালের গান ও লোকঐতিহ্য: সুকুমার সেন, প্রাচীন বাংলা ও বাঙালী, পৃষ্ঠা: ১৮০–১৮৫।
[8] নয়পাল ও অতিশ দীপঙ্করের মধ্যস্থতা: রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রথম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৭৪–৭৫।
[9] তৃতীয় বিগ্রহপাল ও সাম্রাজ্যের ভাঙন: রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাস (খণ্ড ১), পৃষ্ঠা: ২২০–২২৫।
[10] দ্বিতীয় মহীপাল ও কৈবর্ত বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট: নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদিপর্ব, পৃষ্ঠা: ৪৪৫–৪৫০।
[11] দিব্যর বিজয় ও পাল রাজবংশের বিপর্যয়: রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রথম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৮০–৮৩।
[12] দ্বিতীয় মহীপালের মৃত্যু ও উত্তরসূরিদের পলায়ন: রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রথম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৮৩।
[13] পাল সাম্রাজ্যের অন্তর্বর্তীকালীন সংকট: রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাস (খণ্ড ১), পৃষ্ঠা: ২৩২–২৩৫।
[14] রামচরিতম ও সামন্ত চক্রের বিবরণ: নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদিপর্ব, পৃষ্ঠা: ৪৫৫–৪৬০।
[15] ভীমের পরাজয় ও বরেন্দ্র বিজয়: রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রথম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৮৬–৯০।
[16] রামাবতী নগরী ও রামপালের সংস্কার: সুকুমার সেন, প্রাচীন বাংলা ও বাঙালী, পৃষ্ঠা: ১৯০–১৯৫।
[17] কুমারপাল ও কামরূপ বিদ্রোহ: রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রথম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৯৫–৯৭।
[18] মদনপাল ও সেন বংশের উত্থান: রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাস (খণ্ড ১), পৃষ্ঠা: ২৬০–২৬৫।
[19] পাল সাম্রাজ্যের পতনের কারণসমূহ: নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদিপর্ব, পৃষ্ঠা: ৪৬৫–৪৭০।
[20] সেন শাসনের প্রভাব: সুকুমার সেন, প্রাচীন বাংলা ও বাঙালী, পৃষ্ঠা: ২১০–২১৫।
[21] বৌদ্ধধর্মের অবনতি ও ধর্মীয় বিবর্তন: রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রথম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৪০–১৪৫।
[22] কৌলিন্য প্রথা ও সামাজিক রূপান্তর: নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদিপর্ব, পৃষ্ঠা: ৫২০–৫২৫।