মঙ্গলে দীর্ঘ মানব অভিযানে পানি, পোশাক ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সরঞ্জাম সীমিত থাকবে। এই বাস্তবতায় মহাকাশচারীদের পোশাক ও নরম পৃষ্ঠে জীবাণুর পরিমাণ কমাতে ‘লন্ড্রি গান’ নামে একটি ছোট যন্ত্র তৈরি করেছেন গবেষকেরা।
ইউনিভার্সিটি অব আলাবামা ইন হান্টসভিলের বিজ্ঞানীরা নাসার মার্শাল স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের সঙ্গে কাজ করে যন্ত্রটির প্রোটোটাইপ তৈরি করেছেন। ২০ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক পরীক্ষায় এটি কাপড়ের জীবাণু স্পোর কলোনি ৭৫ শতাংশের বেশি কমিয়েছে।
কীভাবে কাজ করে যন্ত্রটি
যন্ত্রটি কাপড়ে কোল্ড প্লাজমা প্রয়োগ করে। এটি বৈদ্যুতিকভাবে চার্জযুক্ত কণার মিশ্রণ, যা কাপড়কে অতিরিক্ত গরম না করেই তৈরি করা যায়। প্লাজমার কণাগুলো বাতাসের অক্সিজেন ও জলীয়বাষ্পের সঙ্গে বিক্রিয়া করে অত্যন্ত সক্রিয় অণু তৈরি করে। এসব অণু অণুজীবের বাইরের ঝিল্লি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
তবে এটি প্রচলিত ওয়াশিং মেশিনের বিকল্প নয়। যন্ত্রটি জীবাণু কমাতে পারে, কিন্তু দৃশ্যমান ময়লা, খাবারের দাগ বা কফির দাগ তুলতে পারে না। এর মূল লক্ষ্য কাপড় ধোয়া নয়, বরং জীবাণুমুক্তকরণ।
প্রাথমিক ফলাফল ও সীমাবদ্ধতা
বর্তমান প্রোটোটাইপটি কলমের মতো ছোট এবং একবারে প্রায় এক বর্গসেন্টিমিটার জায়গা প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। ফলে সম্পূর্ণ শার্ট বা স্পেসস্যুট পরিষ্কারে এটি এখনো কার্যকর নয়। গবেষকেরা বড় আকারের হাতে ধরা যায় এমন সংস্করণ তৈরির পরিকল্পনা করছেন।
কাপড়ে স্পোর কলোনি ৭৫ শতাংশের বেশি কমার ফলটি সব ধরনের জীবাণু বা সব ধরনের কাপড়ের ক্ষেত্রে একই হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বাস্তব মহাকাশযাত্রার পরিবেশে এবং বিভিন্ন অণুজীবের বিরুদ্ধে যন্ত্রটির কার্যকারিতা যাচাইয়ে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন। বারবার প্লাজমা ব্যবহারে কাপড়ের স্থায়িত্বও পরীক্ষা করতে হবে।
মঙ্গল অভিযানে কেন দরকার হতে পারে
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে প্রচলিত ওয়াশিং মেশিন নেই। মহাকাশচারীরা পোশাক কয়েকবার ব্যবহার করেন, পরে তা ফেলে দেন বা পৃথিবী থেকে পাঠানো নতুন পোশাক ব্যবহার করেন। নিয়মিত কার্গো সরবরাহ থাকায় এই ব্যবস্থা সেখানে সম্ভব।
কিন্তু মঙ্গলগামী যাত্রা কয়েক মাস দীর্ঘ হতে পারে এবং মাঝপথে নতুন পোশাক পাঠানো বাস্তবসম্মত নয়। জীবাণু নিয়ন্ত্রণে রেখে পোশাক বেশি দিন ব্যবহার করা গেলে কম পোশাক, কম পানি এবং কম পরিচ্ছন্নতাসামগ্রী বহন করতে হতে পারে।
ওজোনের ঝুঁকি ও অন্য সম্ভাব্য ব্যবহার
প্লাজমা অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়ায় ওজোনও তৈরি করতে পারে। উচ্চমাত্রার ওজোন ক্ষতিকর, বিশেষত মহাকাশযানের পুনর্ব্যবহৃত ও সীমিত বাতাসের পরিবেশে। তাই অতিরিক্ত ওজোন অপসারণে পরিশোধনব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছেন গবেষকেরা।
পোশাকের বাইরে স্পেসস্যুট, যন্ত্রপাতি, বিছানাপত্র ও অন্যান্য নরম পৃষ্ঠ জীবাণুমুক্ত করতেও প্রযুক্তিটি ব্যবহার করা যেতে পারে। অন্য গ্রহে পৃথিবীর অণুজীব ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর গ্রহ-সুরক্ষা উদ্যোগেও এর সম্ভাব্য ভূমিকা থাকতে পারে। তবে এসব ব্যবহার এখনো উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে।
মহাকাশে কম পানি ব্যবহারের লন্ড্রি প্রযুক্তি ও বিশেষ ডিটারজেন্ট নিয়েও কাজ চলছে। যেমন, ভবিষ্যৎ মহাকাশ ব্যবহারের জন্য প্রোক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বলের টাইড ইনফিনিটি ডিটারজেন্ট তৈরি করা হয়েছে। গবেষকদের ধারণা, ভবিষ্যতের মঙ্গল আবাসে একটি প্রযুক্তির বদলে একাধিক সমাধান একসঙ্গে ব্যবহার হতে পারে।
সূত্র: মূল প্রতিবেদন
